আমি তখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ি। আমার মায়ের গানের অ্যালবাম থেকে রবীন্দ্রসংগীত “আমি কান পেতে রই” শুনতে আমার খুব ভালো লাগত। আমার ভালো লাগা দেখে আম্মা জিজ্ঞেস করেছিলেন, আমি বুঝতে পেরেছি কিনা কবি কার কথা কান পেতে শুনতে চাইছেন। স্বভাবতই, ওই সময় উত্তরটা জানতাম না, কিন্তু আমার জননী ওইদিন খুব সুন্দর করে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন: এখানে কবি অন্য কোনো মানুষের না, বরং নিজ হৃদয়ের কথা বুঝতে পারার কথা বলেছেন।
গানের কয়েকটি লাইন এখানে দিলাম: “আমি কান পেতে রই, ও আমার আপন হৃদয়গহন-দ্বারে বারে বারে, কান পেতে রই।”
মানুষের একটা গোটা জীবন পেরিয়ে যায়, কিন্তু দেখা যায় নিজের কথা নিজেই কখনো শুনতে পায় না। এই প্রসঙ্গে লালনের “মনের মানুষ”-এর কথা বলব। লালন ফকিরের দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু “মনের মানুষ” কিন্তু অন্য কোনো ব্যক্তিসত্তাকে বোঝায় না। বরং “মনের মানুষ” অর্থ হলো মানুষের নিজের মনের মাঝে বাস করা দিব্য সত্তা। এই দিব্য সত্তাকে বোঝা বা তার সন্ধান পাওয়া সহজ নয়। দিব্য সত্তার সন্ধান না মিললে মানুষ অন্যের বানানো খাঁচায় বা সত্যে নিজেকে গুটিয়ে নেয়।
অথচ মনের মানুষকে খুঁজে পাওয়া মানে নিজের সেই ছাঁচবিহীন, অরূপান্তরিত সত্তাকে চিনতে পারা। এক্ষেত্রে নবনী দাস বাউলের “দেখেছি রূপসাগরে মনের মানুষ কাঁচা সোনা” গানটিতে নিজের এই সত্তাকেই কাঁচা সোনার সাথে তুলনা করা হয়েছে, আর রূপসাগর হলো মনের রূপের সাগর। কিন্তু যখন সত্তা অপরের উপর নির্ভরশীল, তখন অন্যের প্রশংসা বা স্বীকৃতি দিয়ে নিজেকে মূল্যায়ন করে; এতে করে মূল্যায়নের মূল্য কী, তাও সে নিজে নির্ণয় করতে পারে না। আয়নায় বা আরশিনগরে নিজেকে দেখতে পায় না, অন্যের বানানো প্রতিমূর্তিকে দেখে।
২রা মে, ২০২৬।
~যারিন
এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান